. দ্বিতীয় কিস্তি
কবির সুমনের কথায় 'ইচ্ছে হল মগেরমুলুক, ইচ্ছে হাওয়ায় অনিচ্ছেরা দুলছে দুলুক'। তাই তো ইচ্ছে হল আর অনিচ্ছেদের এক লহমায় উড়িয়ে দিয়ে বিঙ্কোর পথ চলা শুরু হল ব্ল্যাকহোলের ভেতর দিয়ে। পথ সেখানে কত দূর গেছে? কতখানি আলো থাকবে? কতখানি পাকাপোক্ত হবে মাটি? অতকিছু ভাবেনি বিঙ্কো।
ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চাকরি ছেড়ে নাগেরবাজারে একটি ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হল সে। সেখানে পিএলসি শেখানো হত। তবে এক লহমায় সবটা বদলে গেল করোনার জন্য কার্ফু জারির সুবাদে। চাকরি নেই, টাকা নেই, মোবাইলের রিচার্জ করার টাকা দিচ্ছেন বিঙ্কোর মা। পড়তে মন চাইছে না তার। অবশ্য তার অনেক কারণ যদিও সে কথা আমাকে জানায়নি তবে বিঙ্কোর নাকি বাড়িতে পড়তে মন বসত না তা তার নিজস্ব পারিবারিক কোনও একটা কারণ বশত। বদলে কবিতা লিখত, গান গাইত আরও অনেক কিছুই করত অথচ দিনের শেষে হিসেব কষলে দেখা যাবে কিছুই করত না।
ফেসবুকে, একটা নিউজ চ্যানেলের জন্য লোক নেওয়া হচ্ছিল বলে বিজ্ঞপ্তি বেরিয়েছিল। ঘরে বসে কনটেন্ট লেখার কাজ। সে খোঁজ বিঙ্কোকে দিয়েছিল তার মাসি তারপর একদিন দেখলাম বুম হাতে বিঙ্কো নানান কভারেজ করতে শুরু করল, কনটেন্ট রাইটিং-এর পাশাপাশি। আমি তখন বেঙ্গালোরে চাকরি করছি, বিঙ্কো তখন রিপোর্টার। বেনামি চ্যানেলের হয়ে নিজেকে মেলে ধরছে একটু একটু করে। তাবড় তাবড় রাজনীতিক ( গ্রামের এমএলএ, রাজ্যের মন্ত্রী, জীবনের শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত ফরওয়ার্ড করা লোক ইত্যাদি) -এর ইন্টারভিউ। অন্যদিকে এই করতে করতে কিছু পরিচিতি তৈরী করেছে।
এভাবেই গ্রাম থেকেই শুরু করল বিঙ্কো। দিনের আলোয় সে কনটেন্ট লেখে, চাঁদ উঠলে ফিজিক্স পড়ায় পাড়ার এক ভাইকে, ওহ্ হ্যাঁ ভুলে গেছিলাম, বিকেলে একটা বাচ্চা মেয়েকে অল সাবজেক্ট দেখিয়ে দিত ৫০০ টাকার বিনিময়ে। করোনা কাটছে না, আর কাটছে না বিঙ্কোর এই খিচুড়ি জীবনযাপন। এই করতে গিয়েই হারাল কবিতা লেখার হুজুক। আমাকেও ফোন করা বন্ধ করেছে ও। একটু একটু গীটার বাজানো শিখছে আর ফেসবুকে গান গাইছে। পরে আমিও আর ওর সাথে যোগাযোগ করতাম না, ফেসবুকে দেখতাম। করোনার পরবর্তী সময়ে ওর কাজের জন্য প্রশংসিত হল বিঙ্কো। এবার আর গ্রামের নেতা মন্ত্রী নয় শহরে যেতে হবে তাকে। ডাক পড়ল। শুরু হল অন্যরকম পথ চলা। সেলেব্রিটির ইন্টারভিউ,সিনেমার কভারেজ, মেগা সিরিয়ালের অন্তরালের রহস্য। তার চোখে তখন রূপলি স্বপ্নের মেঘাচ্ছন্নতা। তারপর যেমনটা হয় স্বপ্ন কাটতেই ধপাস করে পড়ল বাস্তবের দুনিয়ায়। যতটা স্যালারি হওয়ার কথা ছিল, আর যা যা কথা হয়েছিল তার একটাও মানেনি চ্যানেল কর্তৃপক্ষ। অগত্যা চাকরি ছাড়ল বিঙ্কো। তখন ওর নিশ্চয় মনে হয়েছে আজ ইঞ্জিনিয়ারিংটা করলে গত ৩ বছরে আজ ও অনেকটাই উপরে উঠতে পারত! কিন্তু কে শোনে কার কথা? ওই ছেলেকে আটকানো অত সহজ নাকি? আতিপাতি চ্যানেলের চাকরি ছেড়ে ইন্টারভিউ দিল একটি ন্যাশনাল চ্যানেলের ডিজিট্যালে। চান্স মে ডান্স মারতে বিঙ্কো জানে। এবার সে পাক্কা সাংবাদিক। বিনোদনের দুনিয়ায় সে টুকটাক ভালোয় ভাব জমিয়েছে। নতুন নতুন চমকপ্রদ কাজ করছে। আর ওকে লোভ ধরাচ্ছে ওর বস্। তাতে বিঙ্কোর লাভ হলেও বাড়ছে শত্রুতা ওর সহকর্মীদের সাথে। তাতে কিছু যায় আসে না বিঙ্কোর। সে জানে মারপ্যাঁচে নয় কাজই তার আসল পরিচয়। তবু মাঝে মাঝে একলা রাতে মেসের তক্তাপোশে সে কাঁদে আর মনে করে তার ফেলে আসা গ্রাম, নদী, পথ, মায়ের কথা আর সেই রবিবারের দুপুরে দাদার সাথে ওদের পুকুরের বড় কাতলা মাছের মাথা খেতে খেতে শক্তিমান দেখা। সে সব অনেক অতীতের কথা যা এখন অযথা হয়ে গেছে। জীবনের কাছে সে কি তাহলে হেরে গেছে? নাকি জীবনের কাছেই সে বাজি রেখেছে জীবনকেই? বুঝতে পারছেন না নিশ্চয়? আমিও পারছি না, নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে বিঙ্কো কেন অনিশ্চয়তার পেশাতে পা রাখল যেখানে একবার পিছলে গেলে ও আর আস্ত থাকবে তো? কিন্তু বিঙ্কো কি আদৌও এসব ভাবে?

Comments
Post a Comment