পৃথিবীতে বসে পৃথিবীর সন্ধানে নেমেছি আমি। কারণ পেশাদার সাংবাদিকের তকমা তখন আমাকে ভাবাচ্ছে অফিসের বসের লাল কালীর মতো বাক্য টা 'ইন্টারভিউ লাগবে, দুমাস হয়ে গেল একটাও ইন্টারভিউ হয়নি সুদীপ্ত''। যেমন বলা তেমন কাজ, কাজ নাকি চিন্তা ঠিক বোঝাতে পারব না। চিন্তাকেই আপন করে নিলাম এবং পৃথিবীতে বসে পৃথিবীর খোঁজ করতে শুরু করেছি।
একটা নম্বরে কল করেছি যে নম্বরে আগেও একবার ম্যাসেজ করে ছিলাম অথচ কোনও উত্তর আসেনি কিন্তু সেদিন হঠাৎ ফোনের ওপাশে যে ভদ্র মহিলা ফোন ধরলেন এবং বললেন, 'কে বলছেন'? এই সুযোগ আমি হারাতে চাইনি। সমাচার প্লাস বাংলা থেকে এন্টারটেইনমেন্ট জার্নালিস্ট সুদীপ্ত কথা বলছি, কৌশিক দার সাথে কথা বলতে চাই। 'হ্যাঁ দিচ্ছি ধরুন একটু' বলেই এরপর যিনি 'হ্যালো' বললেন তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়নি এর আগে কিন্তু তাঁর 'ক্লাসরুম' আমি শুনেছি আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগে। সেদিন থেকেই অপেক্ষা, যে অপেক্ষা আমাকে ইঞ্জিনিয়ার থেকে খবরওয়ালা বানাবে কি'না আমি জানতাম না।
ফোনের ওপার থেকে ডেট পেলাম, পরের দিন সকাল ১০ঃ৩০ টায় কৌশিক দার বাড়িতে। বুকের ভেতর তখন বাজছে ছুটির ঘন্টা কারণ একটা অ্যাসাইনমেন্ট মানে একটা ছুটি (আমার কাছে)। যে ছুটিতে আমাকে কপি লিখতে হয় না, ব্রেকিং নিয়ে কোনও দায় নিতে হয় না। শুধু কীভাবে শুরু আর কীভাবে শেষের মাঝে কতগুলো প্রশ্ন আর মানুষকে ধরে রাখার একটা চেষ্টা করতে হয়(যে চেষ্টা আমি কী করে উঠতে পারছি?)।
(ইন্টারভিউটি দেখতে উপরের লিঙ্কে ক্লিক করুন)
ডেস্কের ওপর নোটিশ পিনে সাঁটিয়ে দিলাম ডেট এবং কৌশিক চক্রবর্তী নামটা। অবশেষে এলো সেই দিন (পরের দিন)। ফোন করে সকালেই জানিয়ে দিয়েছি দিদি কে(কৌশিক দার বউ)। আমরা আসছি ১০ঃ৩০ থেকে ১১ টার মধ্যে। বেজায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হবে নাই বা কেন, 'একা দোক্কা'র মালিক যখন স্বয়ং কৌশিক চক্রবর্তী তখন বৃষ্টি তো সারাবেলার সঙ্গী হতেই চাইবে তাই না? বৃষ্টি থামলো, ক্যামেরা পার্সেন অর্ঘ্য দা (যে ছাড়া আমি শূন্য), ট্রাইপড(যেটা ছাড়া ক্যামেরা মেরুদণ্ড হীন), বুম( যেটা ছাড়া শব্দহীন পরিস্থিতি) আর আমি মিলে পৌঁছে গেলাম পৃথিবীর পৃথিবীতে।
কাকিমা (কৌশিক দা'র মা) আমাদের দরজা খুলে দিলেন, ডাক নাম (নামটা মনে নেই) ধরে ছেলেকে বললেন 'ওরা এসেছে'। আমরা ভেতরে গেলাম। পৃথিবী ম্যান তখন রান্না করছেন (গানের রেসিপি) । আমরা ২-৩ মিনিট চুপ করে আছি। তারপর বললেন 'একটু দাঁড়াও, আসলে একটা কাজ চলছে , আচ্ছা কোথায় নেবে ইন্টারভিউটা? ক্যামেরা পার্সেন বলল এই ঘরেই। থরে থরে বই সাজানো রয়েছে, দেওয়ালে রয়েছে নিজের জীবনের সাথে জড়িত প্রাপ্তির খসড়া। পাশাপাশি বসলাম আমরা [কৌশিক দা এবং তাঁর ভক্ত(সাংবাদিক বলে কিছু হয় না তখন) ] ক্যামেরা রেডি হলো। ইন্ট্রো দিয়েছি প্রশ্ন শুরু হয়েছে। 'শহরের ছবি গুলো' গানটা শুনব। গাইতে যাওয়ার আগে দাদা বললেন, 'এই গান তো কেউ শুনতে চাই না, বেশ ভালো লাগছে তোমরা চাইছ'। পৃথিবীর বাইরে এসে কৌশিক চক্রবর্তী'র অন্য একটি পৃথিবী আছে যা তাঁর ইউটিউব ঘাঁটলেই বুঝতে পারা যাবে। আমি তো বলেইছি সাংবাদিক নই, ফ্যান আমি। আমি তখন নিজের চোখে কৌশিক চক্রবর্তীকে গাইতে দেখার আনন্দের লোভ সামলাতে পারছি না।
নিঁখুত ভাবে বির্তকের প্রশ্ন গুলোকে পাশ কাটালেন গায়ক। বুঝতে পারলাম খুব শান্ত মস্তিষ্ক। উস্কে দিতে খুব একটা পারলাম না তবুও চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? কিন্তু সেই চেষ্টাও প্রায় বেফলে যেতে বসেছে। কিন্তু ডেপো সাংবাদিক (ফ্যান থেকে সাংবাদিক হয়ে উঠেছি এবার) প্রশ্ন করেই ফেলেছে 'চুমুর জন্য কী আড়াল দরকার'?("চুমুর আড়াল" তাঁর একটি গান) এর উত্তর কিছুটা হেসেহেসেই দিয়েছেন গায়ক কিন্তু বেশি জেরাবেড়ি করতে গেলেই ওমনি বললেন 'চুমুটা খুব ব্যক্তিগত'। মানে আমাকে থামতে বলছেন তিনি, বুঝলাম।
প্রশ্ন পর্ব শেষ বাকিটা চাটনির মতো আর ভোজের শেষে আইসক্রিমের মতো কিছু র্যাপিড ফায়ার আর নিজেকে গুচ্ছের থেকে আলাদা করার একটা প্রয়াসে দুটো রাউন্ড রেখেছি। যখন সবটা শেষ হলো তখন একটু আড্ডা হলো। প্রশংসা জিনিসটা কার না শুনতে ভালো লাগে(আমার তো ভালোই লাগে)। তাই তিনি যখন বললেন 'খুব ভালো লেগেছে আমারা এই প্রশ্ন গুলো, তোমাকে আমার ফোন নম্বরটা শুধু তোমার জন্য দিলাম, কাউকে দিও না' আর সেই সাথে আমার কর্মজীবনের প্রমাণ পাতায় আমি একটা অটোগ্রাফ কুড়িয়ে নিয়েছি তাঁর। প্রথম কোনও সাংবাদিক তাঁর কাছে অটোগ্রাফ নিয়েছে ইন্টারভিউ নিতে এসে। এতে তিনি হয়তো আশ্চর্য হয়েছেন কিন্তু আমি হয়নি কারণ আমার কাছে তখন কেবল অপেক্ষার অবসান (পৃথিবীর মালিককে কাছ থেকে দেখার,শোনার)। ইন্টারভিউ শেষ হলো, আমরা ছবি তুললাম, ঈশিতা দি চা করে আনলেন। বাইরে তখন মেঘলা এবং নিরালা একটা দুপুর, ঘরের ভেতর পৃথিবী আর পৃথিবীর সমস্ত গানের ইতিহাস বহনকারী সেই মানুষটি যাঁর থুতনিতে কাঁচা-পাকা দাড়ির গুচ্ছ এবং 'ভিজছি আমি চায়ের কাপে / আমি ভিজছি আজ একটু অন্যভাবে"।

Comments
Post a Comment