অষ্টমীতে দেখা হচ্ছে
কলমেঃ- সুদীপ্ত সেন
ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করে আজ প্রায় তিনবছর হলো আমি ব্যাঙ্গালোরে থাকি। পুজো আমার প্রতিবারই মিস হয়ে যায় যেকোনো কারণেই, এই তো আগেরবার পুজোর সময়ে বাড়ি আসব এমন সময় শরীরটা খারাপ হলো ঠিক পুজোর আগেই আর পরে সেই ছুটি ম্যানেজ করলাম পুজোর সময়। যখন বন্ধুরা পুজোর হুল্লোরের ছবি পোস্ট করছে তখন ফেসবুক scroll করা আমি আমার ব্যাঙ্গালোরের ফ্ল্যাটে বসে আমার গ্রামের পুজোর গন্ধ পাচ্ছি।
ব্যাঙ্গালোরের মেঘ সবসময়েই পুজোর মতোই মনে হয় আমার আর তারজন্যই গ্রামের সেই শরতের আকাশকে আমি মিস করি না কিন্তু মায়ের হাতের নাড়ু, অষ্টমীর সকালে স্নান সেরে পাঞ্জাবী পরে পুষ্পঞ্জলি দেওয়া আমি মিস করি ভীষণভাবে আর একান্তই যেটা আমি কোনো মতেই ভুলে যেতে পারি না সেটা হলো পুজোর জন্য একমাস আগে থেকেই চাঁদা তোলার মজাটা।
এবছর তাই ফিরতেই হবে বাড়ি আর নয় অনেক হলো। লোকডাউন, মহামারি সব কিছুকে পিছনে ফেলে ব্যাঙ্গালোর থেকে সোজা আমার বাড়ি ফেরার প্ল্যান একদম পাক্কা।
এই সমস্ত ভেবেই আমি আমরা প্যাক করা শুরু করে দিয়েছি এখন থেকেই, মনে মনে দিন গুনতে শুরু করেছি। আমার খুব মনে পড়ছে সেই ছোটোবেলার কথা যখন পুজোর আগে ইউনিট টেস্ট দিয়ে আমাদের ষষ্ঠীর দিন থেকে পুজোর ছুটির ঘন্টা পড়তো। কোনো কোনো বার ষষ্ঠীর দিন রবিবারে পড়লে আমরা ছুটি পেতাম পঞ্চমীর দিন থেকে। এটা আরও আনন্দের ছিলো আমার কাছে যেনো বোনাস পাওয়ার মতো।
মাকে জানিয়ে দিয়েছি যে এবছর আমি আসছি পুজোতে । বোধনের ঘটে আমার পাড়ার মা-কাকিমারা ধুপ দেখায় যেটা আমি শেষ দেখছি প্রায় ছয়বছর আগে। বাকি তিনবছর হোস্টেলে কাটিয়ে আরও তিনবছর খটমটে চাকরিজীবী হয়ে কাটিয়ে দিলাম ব্যাঙ্গালোরে।
সেদিন রাতে হঠাৎই একটা চেনা নম্বর থেকে ম্যাসেজ এলো হোয়াটসঅ্যাপে। হ্যাঁ নম্বরটি চেনা কারণ সেভ আছে কিন্তু নানা ব্যস্ততার কারণেই সেইভাবে যোগাযোগ নেই বেশি কয়েকবছর।
হ্যালো অপু কেমন আছিস?
ইন্দ্রাণীর ম্যাসেজ। ইন্দ্রাণী আমার ছোটোবেলাকার স্কুলের বন্ধু, বহুবছর
যোগাযোগ নেই।
ম্যাসেজের উত্তর দিলাম। হ্যাঁ ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?
ইন্দ্রাণী বললো ভালো আছি। তুই কোথায় থাকিস, বহুদিন কথা নেই। ফেসবুকে দেখি তোকে, তোর লেখা পড়ি বেশ লাগে।
ইন্দ্রাণীকে উত্তর দিলাম, ধন্যবাদ। আমি এখন ব্যাঙ্গালোরে থাকি । হ্যাঁ ব্যস্ততার কারণেই কথা হয়নি। তুই কি করছিস এখন?
ইন্দ্রাণী জানালো, আমি MBA করে এখন ব্যাঙ্গালোরেই থাকি।
শুনেও ভালো লাগলো, পুরনো বন্ধু ব্যাঙ্গালোরে আছে এটা জেনে।
তারপর এখন বেশ কথা হতে থাকলো আমাদের মধ্যে।
ও একদিন হঠাৎই বললো চল না সময় করে দেখা করি আমরা ?
করোনার জন্য এখানে খুব একটা বাইরে বেরুই না আমি, তার ওপর আগের বারের শরীর খারাপের কথা আমি ভুলে যাইনি। তবুও পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা করার ইচ্ছেটা একমুহূর্তের জন্যেও মিস করতে চাইলাম না আমি।
২৭ শে সেপ্টেম্বর আমরা দেখা করলাম একটা কফিশপে।
ও একটা সাদা রঙের কুর্তী পরে এসেছিলো। একই আছে অবিকল শুধু এখন ছোটো করে চুলটা কেটে নিয়েছে সে।
কফিশপটা নির্জন ছিলো, আর থাকবে নাইবা কেনো? এই মহামারীর সময়ে খুব একটা ভিড় থাকার কথা নয় তাই নির্জনতার ভিড় হয়ে আমরা দুটো কফি অর্ডার করে বসলাম মুখোমুখি।
ইন্দ্রণী বললো, কি রে অপু তারপর খবর কি তোর?
ও বরাবরই এভাবেই কথা বলে, এভাবে মানে ওই মস্তানি এবং হেয়ালিটাকে একটু মিশিয়ে দিয়ে।
আমি বললাম এই চলছে যেমন চলার।
ইন্দ্রাণী বললো, চলছে মানে, কতটা চলছে আর কি চলছে, FOGG ?
হইহই করে হেসে নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে বললাম FOGG চলছে না তবে জীবন চলছে চলার মতো করে।
এবার আবারও সটান একটা প্রশ্ন দিলো আমাকে, আচ্ছা প্রেম করছিস?
প্রশ্নটা শুনে বিষম খাওয়ার মতো হয়েছিলো আমার। না মানে প্রেম শুনে নয় আসলে ইন্দ্রাণীর মুখে প্রেম শব্দটা শুনে আমি থমকে গেলাম কিছুটা।
ও আমাকে আস্বস্ত করে বললো, আরে এমনিই অন্যকিছু নয়, বল না।
আমি বললাম প্রেমটা সেই দ্বাদশ শ্রেণীতে করতাম আর সেইখানেই ফেলে এসেছি।
ইন্দ্রাণী বললো অষ্টাদশীর একজন মেয়ে সেই সময় হ্যাঁ বলতে না পারুক কিন্তু চব্বিশে এসে হ্যাঁ বলে ফেলতে শিখেও গেছে হয়তো।
কথাটা বলতেই দু-মিনিটের জন্য আমি থেমে গেলাম। মনে পড়ছে, স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানের কথা, একটা ফর্সা, চঞ্চল মেয়ে একটা লাল রঙের শাড়ি পরে রবীন্দ্র সংগীত গায়ছে। ("আয় তবে সহচোরী হাতে হাতে ধরি ধরি") যা শুনে ক্লাসে প্রথম হওয়া ছেলেটি বায়োলজির ল্যাবে মেয়েটিকে প্রপোজ করলো৷
এই যে শুনছিস, তুই গানটা কিন্তু দারুণ গায়লি, প্রেম করবি আমার সাথে।
আমি এরকমই স্পষ্ট বক্তা বরাবরই কিন্তু ওর থেকে স্রেফ জবাব ছিলো স্যারকে বলে দেব। ব্যস তারপর সবটা থমকে গেলো।
ইন্দ্রাণী গলা ঝারলো, আমার হুঁস ফিরলো। ও বললো কি রে আশা করি প্রেম করিস না তবে তোর লেখার নীচে ফেসবুকে অনেক মেয়ের কমেন্ট দেখি কিন্তু বুঝতে পারি এরা তোর কেউ হয় না।
আর হ্যাঁ প্রেমটা আমারও হয়ে ওঠেনি অপু।
তবে এবার প্রপোজ করলে স্যারকে বলবো না পাক্কা প্রমিস।
এবার দুজনেই হাসলাম আমরা।
ইন্দ্রণী বললো, এবার পুজোতে বাড়ি যাবো, তুই যাবি তো?
ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললাম, এই দিনটা যে আসবে সেটা হয়তো ভাবিনি তবে পুজোতে আমিও বাড়ি যাচ্ছি এবার।
আর সেদিন অষ্ঠাদশীর মেয়েটাকে লাল শাড়িতে মন্দ লাগেনি তবে চব্বিশের এই ছোটো চুলের মেমসাহেবকে অষ্ঠমীর সকালে লাল শাড়িতে কেমন লাগে সেটা দেখতে চাই।
পুজোতে দেখা হচ্ছে, এইটুকু বলে কফির চুমুক শেষ করে বিল মিটিয়ে বেড়িয়ে গেলাম দুজনে।
হাঁটতে হাঁটতে ও গান ধরলো "আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি নাচিবে ঘিরে ঘিরে গাহিবে গান"।
---------------------সমাপ্ত-----------------------
আমার ঠিকানা
গ্রাম+পোস্টঃ- পাইকর
জেলাঃ- বীরভূম
পিনঃ- ৭৩১২২১
থানাঃ- মুরারই
Comments
Post a Comment