১.)
ভিক্টোরিয়া
এক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর কলকাতাকে দেখব বলেই বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। দমদম থেকে সোজা একটা ট্যাক্সি করে সদন। সদনে নেমেই নন্দন আর নন্দনের উল্টোদিকের গেট দিয়ে পার হলাম রাস্তা। সামনে মোহরকুঞ্জের গা বেয়ে হাঁটতে লাগলাম এবার ভিক্টোরিয়া। বাহ্ বৃষ্টির পরে ভিক্টোরিয়া যেনো অপূর্ব৷ এই অপূর্ব বলার সাথে সাথেই সামনের রাস্তায় একটা ট্যাক্সি থামলো। একটা ছিপছিপে চেহারার মেয়ে নেমে এলো, পরণে সাদা রঙের কুর্তী। হাতে একটা ছোটো ব্যাগ, কালো রঙের একটা টিপ, টিপিটা ছোটো কিন্তু বেশ লাগছে টিপ পরা মেয়েটিকে দেখতে।
আলগোছে একটু সরে গিয়ে একটা সিগারেট ধরলাম, মেয়েটা এগিয়ে আসছে। ইচ্ছে করেই ধরালাম সিগারেট টা, আসলে ওই যে, উর্তি বয়সে এরকম সত্যবতীকে দেখে হালকা ব্যমকেস সাজতে কার না ইচ্ছে করে বলুন তো? সপাটে হেঁটে এসে মেয়েটা আমার সামনে এসে দাঁড়ালো, বাবা এতো মেঘ না চাইতেই জল।
মেয়েটা বললো, আচ্ছা দাদা ভিক্টোরিয়ার টিকিট টা কোথা থেকে কাটবো? সুযোগ হারাতে চাইলাম না, বললাম আমি গাইড, কলকাতা দেখানো আমার কাজ চলুন আমি কাটিয়ে দিচ্ছি, ১০০ টাকা দিন। ১০০ টাকা নিয়ে ২ টো টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম। বললাম আর পাঁচজন গাইডের চেয়ে আমারটা একটু অন্যরকম। মেয়েটা বললো আমি জানি আপনি গাইড নন তাই অন্যরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক তাই নয় কি? বেশ হকচকিয়ে, ইতস্তত হয়ে ৫০ টাকা টা দেব বলে ম্যানিব্যাগটা বের করতে যাবো কিন্তু মেয়েটা হাত ধরে নিলো। বললো থাক না। আজ আমি আপনাকে ভিক্টোরিয়াটা দেখাচ্ছি আর আপনি না হয় অন্য একদিন দেখাবেন।
আসতে আসতে বন্ধু জমলো খুব। আমিও শুরু করলাম বলা, উনিও বললেন। বুঝতে পারলাম খুব বড়ো লোক বাড়ির এবং আদুরে একটি মেয়ে। আজ ঝগড়া করে, রাগারাগি করে বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। কথা বলতে বলতে লক্ষ্য করলাম টিপ টা কিঞ্চিৎ সরে গেছে কপালের পার্টিকুলার জায়গা থেকে একটু নীচের দিকে। বললাম টিপটা ঠিক করে নিন, মেয়েটা বললেন ধুর ছাড়ুন তো যতসব, এই বলে টিপটা খুলে ফেলতে যাবেন এমন সময় হাতটা ধরে আটকে নিলাম আর টিপ টা ঠিক জায়গায় পরিয়ে বললাম এবার ঠিক আছে। এতোটা সাহস আমার আছে বলে আমি জানতাম না এতোদিন, তবে আজ দেখলাম আমার সাহস আছে মানতে হবে। মেয়েটা আবার একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন, কী ব্যাপার আমাকে পটাতে চাইছেন নাকি?
আমি বললাম না, পটাতে চাইছি না। তবে আপনাকে টিপটা পরে ভালো লাগছে তাই বললাম। এবার একটা হাসি হেসে বললো, বলছেন, ভালো লাগছে আমায়?
আমি বললাম হ্যাঁ, বেশ লাগছে, একটু ওভার স্মার্ট হতে গিয়ে বললাম ভিক্টোরিয়া ওকম্পোর মতো লাগছে। মেয়েটা কিরকম একটা থমকে গেলো, বুঝলাম আমার পাকামোটা খাটলো না।
ভিক্টোরিয়ায় সন্ধ্যে নেমে এলো, মেয়েটা বললো আমি জনতাম কোথায় টিকিট পাওয়া যায় কিন্তু একটা হাত খুঁজছিলাম জানেন তো, যে হাতটা ধরে একটু ঘুরে দেখা যাবে, একটু কথা বলা যাবে। ও আপনার নাম টা জানা হয়নি তবে জানবও না। কিন্তু আমি আপনার একটা নাম দিলাম ব্যমকেস। কি পছন্দ তো?
আমাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না কিন্তু নামটা থেকে যাবে ব্যমকেস বাবু।
কথা গুলো শুনে বড়ো অদ্ভুতরকমের অবাক হলাম। মেয়েটা শেষবারের মতো গেট থেকে বেরিয়ে বললো,
ও হ্যাঁ শুনুন....
একটি মেয়েকে ট্যাক্সি থেকে নামতে দেখলে সিগারেট ধরাতে হয় বুঝি?
২.)
স্টেশন
স্টেশনে বসি আছি অনেকক্ষণ। ট্রেন আসবে সেই ১১ টার সময়, এখন সন্ধ্যে ৮ টা বাজে। স্টেশনের ওপরে বসে থাকা দোকান গুলো থেকে বার্বনের একটা বিস্কুট আর লিটিল হার্ট কিনলাম৷ লিটিল হার্টের প্যাকেট টা ছিঁড়তেই বৃষ্টি শুরু হলো। হালকা হালকা শীত করছে, বৃষ্টির ওপর স্টেশনের লাইট গুলো পরে এমন একটা মাদকতার সৃষ্টির হচ্ছে যা বলে বোঝানো কঠিন, এমন সময় আমার সামনের দিকে মানে ডাউনের দিকে বসে ছিলেন সুন্দরী এক ভদ্রমহীলা।
উনি আমাকে দেখননি কিন্তু আমি দেখছিলাম উনাকে। দেখতে দেখতে হঠাৎ করে উনিও বুঝতে পারলেন। খটকা লাগলো কি জানি ওইভাবে তাকিয়ে ছিলাম বলে কিছু বলবেন কিনা আবার।
না সেভাবে কিছু বললেন তবে কেমন একটা ইতস্তত হলেন বুঝতে পারলাম।
কিছু করার নেই ইতস্তত তিনি হতেই পারেন কিন্তু আমার চোখ যতই চেষ্টা করছি শুনছে না ওই হয় না নিজেকে সামলে নেওয়া সহজ কিন্তু চোখকে নয়। সেই স্টেশনে ঘুঘনি ওয়ালা, চা ওয়ালা ছাড়া বিশেষ কিছু যাত্রী নেই হয়তো বৃষ্টির দিন বলেই আর কি।
একটু সময় পর মহিলাটি একটা চা কিনলেন, চায়ের কাপে চুমুক দিলে তাকে বৃষ্টির মধ্যে জলপরির মতো দেখতে লাগছে, হ্যাঁ একটু বাড়িয়েই বলছি বলতে পারেন তবে ভালোই লাগছে। আমি জানি আমি আপ আর উনি ডাউনের ট্রেন ধরবেন। opposite side so এটাই স্বাভাবিক তবুও একই ভাবে উনার দিকেই দেখছি আমি। কিছুক্ষণ পর উনিও আমাকে লক্ষ করলেন মনে হলো কিছু একটা বলবেন এমন সময় এতোটাই বৃষ্টি এলো যে সামনে বৃষ্টি ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না তখন। হঠাৎ একটা কন্ঠস্বর এই যে শুনছেন। খুব বিস্মিত হয়ে দেখলাম ওই মহিলায় এখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন৷ বললেন, সেই তখন থেকেই দেখছি আপনি আমায় দেখছিলেন, আসলে আমি ডাউনে যাবো আপনি হয়তো আপে কিন্তু আমার ট্রেন ১০ টায় আসবে তাই ভাবলাম তাহলে একটু গল্প করা যাক আপনার সঙ্গে। ভেবেছিলাম রেগে গেছেন কিন্তু এরকম একটা ব্যবহারের পর আমাকে আর দেখে কে। বললাম হ্যাঁ হ্যাঁ গল্প তো করাই যায়। আমারও ট্রেন ১১ টায়। এটা বলেই আলাপ করলাম শুরু। আমার নাম অভীক রায় আপানর নাম। মিথিলা, আমার নাম মিথিলা ভৌমিক। যাবো কলকাতা মাসির বাড়ি। ও আচ্ছা আমি যাবো শিলিগুড়ি। ওখানেই চাকরি করি।
আপনি চা খাবেন তো, নানা চা খাবো না ওই তো তখন খেলাম। বেশ তবে আপনি বিস্কুট নিন, এবার বার্বনের বিস্কুটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলাম তাকে। তারপর গল্প জমলো, বৃষ্টি থামলো, ৯ঃ৩০ মিনিট। ডাউনের জন্য অ্যানাউন্স হলো। উনি বললেন আসি তাহলে। এই বলেই একটা হ্যান্ডসেক করে উঠে গেলেন তিনি। আমার ট্রেন ১১ টায়।
এইভাবেই বিভিন্ন স্টেশন জুড়ে হঠাৎ একটা না হওয়া গল্প তৈরী হয়, আবার ফুরিয়ে যায় শেষ হবার আগেই, এভাবেই বিভিন্ন মানুষ হঠাৎ করেই খনিকের ভালোলাগায় মিশে যায় মনের মধ্যে তারপর ঠিক ট্রেন আসে তারপর সবটাই আগের মতো হয়ে যায়। কারোর মুহূর্ত মনে থাকে কারোর বা মনে থাকে না নিভে যায় যাবতীয় কর্মকান্ডে।
অথচ একটা হ্যান্ডসেক জুড়ে যায় যাবতীয় ইতস্ততের মাঝে।
(up এর ট্রেনের অ্যানাউন্স)
কলমেঃ- সুদীপ্ত সেন
Comments
Post a Comment