বুড়ো-বুড়ি
একটু শীত শীত লাগছে। আচ্ছা এদিকে এসো দেখি .....
জড়োজড়ো, কাঁপাকাঁপা হাতে মাফলারটা গলায় চাপিয়ে দিলেন বৃদ্ধা।
হ্যাঁ মনে পড়ে যাচ্ছে, যেবার প্রথম তাদের দেখা হলো, দিনটা তাদের বিয়ের দিন। আগে তো আর বিয়ের আগে ওইভাবে দেখা হতো না এখনকার মতো, বাড়ির বড়ো'রা যেটা ডিসিশন নিতেন সেটাই হতো।
তারপর এরকম ভাবেই অপরিচিত দুজন পরিচয় হতে হতে পরিচিত হয়ে যায় নিজেদের কাছে, অভ্যেসের কাছে, পছন্দের কাছে, ঝগড়ার কাছে, খারাপ লাগার কাছে, সুখের কাছে এবং স্পর্শের কাছে।
তখন একটা সময় ছিলো,তখন বিবাহবার্ষিকীতে এতো হুল্লোড় হতো না এখন কার মতো তবু বৌ-বাজারের মোড় থেকে আমার জন্যে দু-ডাল সতেজ রজনীগন্ধা নিয়ে এসেছেন মানুষটি প্রতিবার। প্রতিমাসে মাইনে পেয়ে 'ভীম নাগের' সন্দেশ কিনে এনেছেন , কতবার আমার মাইগ্রেনের ব্যথার জন্য অফিস ফিরে এসে নিজে হাতে রুটি করেছেন বাড়ির সবার জন্য। পিরিয়ডের দিন গুলোতে জল খেয়েছি কিনা, ব্যথা হচ্ছে কিনা, এসবের খোঁজ নিয়েছেন লোকটা।
খুব জেদ করার পর একবার পুরী বেড়াতে নিয়ে গিয়ে কাঠের পুতুল কিনে দিয়েছিলেন আমাকে। বড়ো খোকা হওয়ার পর খুব দুষ্টুমি করতো, সেবার আমার খুব জ্বর, রাত তখন ২ টো, বড়ো খোকা ক্যাঁথাতে পায়খানা করে দিয়ে খুব কাঁদছে বয়স তখন তিন মাস। আমি উঠে দেখার অবস্থায় নেই, লোকটা নিজে হাতে সবটা ঠিক করে আবার আমার কপালে একটা জলপট্টি ভিজিয়ে দিলেন। সেবার বড়ো খোকা বুঝতে পেরেছিলো বোধহয়, তাই সে পুরো রাত শান্ত হয়ে ছিলো।
আজও সেসব সাজানো আছে মনের মধ্যে। পেনশনের টাকায় দুই বুড়োবুড়ির চলে যায়৷ বড়ো খোকা বিলেতে থাকে, ছোটোমেয়ে প্রেম করে প্রেমিকের সাথে পালিয়ে ছিলো আর খোঁজ পাইনি বহুকাল।
আমাদের প্রেম করে বিয়ে হয়নি, বিয়ের পর প্রেম হয়েছিলো কিনা জানিনা তবে ভালোবাসাটা খুব নিঁখুত হয়ে হয়েছিলো যা আজকাল আর খুব বেশি দেখা যায় না।
মানুষটার একটু ঠান্ডাতেই কষ্ট হয় এখন, মেট্রোতে উনি খুব বেশি উঠেন না কিন্তু পেনশনের টাকা তুলতে এসেছিলেন আজ। আমিও এসেছিলাম উনার সঙ্গে, চোখে ইদানিং খুব একটা ভালো দেখতে পান না। আর আমিও তাঁকে একা ছাড়তে পারি না। একটা ছাদের তলায় বৈবাহিক বন্ধনে দুটো মানুষ একসাথে অনেক বছর কাটালে একটা বন্ধন তৈরী হয় আবার সেটা ভেঙেও যায় কিন্তু ভালোবাসা তৈরী হলে আমার ছোটো মেয়েরও খবর থাকতো আমার কাছে। আর সেও একদিন আমারই মতো তার আপন মানুষের ভালো লাগা-মন্দ লাগায়, কষ্টে-সুখে, সুস্থ-অসুস্থায় একসাথে বুড়ো হতে পারতো।
কলমেঃ- সুদীপ্ত সেন (ডট.পেন)
ছবিঃ- ফেসবুক থেকে কালেক্টেড
Comments
Post a Comment