গল্পের নামঃ- বৃষ্টিবউ
লেখাঃ- সুদীপ্ত সেন (ডট.পেন)
গড়িয়ার সাত নম্বর লেনের বাসিন্দা জয়দীপ। জয়দীপ রায়, গালে এক চাপাল দাড়ি, মাস্টার ডিগ্রীতে পাঠ্যরত একটা অশৌখিন লেখক-লেখক চেহারার ছেলে।
বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের একটা ছেলে জয়দীপ। বাবার বিশাল ব্যবসা, ছোটো একটা ভাই, মা গৃহবধূ আর এক দিদি যার বিয়ে হয়ে গেছে দক্ষিণ কলকাতায় বছর পাঁচেক আগে।
জয়দীপর সাথে আমার পরিচয় হয় হঠাৎই ওই লেখালেখির সূত্রে কোনো এক পত্রিকার বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে। জয়দীপের অন্যরকম কলম টান আছে। কোনোদিন সময় পেলে দেখাব আপনাদের।
আমরা ভালোই বন্ধু দুজনে। আমরা রোজ গঙ্গার ধারে বসে রবীন্দ্রসেতুতে তাকিয়ে থাকি সেখানে কিছুক্ষণ ফেসবুক ঘাঁটাঘাঁটি করে জয়দীপ আর তখন ও আমার সাথে কথা বলে না, আমিও বলিনি কোনোদিন।
তারপর ঠিক সন্ধ্যেলাগোয়া করে উঠে যায় আমরা আর জয়দীপ যেটা বলে রোজ সেটাই বললো আজও।
তারপর একটা পাঁচ টাকার সিলকাট, গোপী দার দোকানের চা আর একটা প্রজাপতি বিস্কুট। কোনোদিন ও একটার টাকা দেয় বা কোনোদিন আমি।
তবে ইদানিং সে একটা ছোটো কাগজের অফিসে চাকরি করে, শুনেছি তার কোনো এক দূর সম্পর্কের দাদা এই চাকরিটা করে দিয়েছে তাকে।
ভালোই চলছিল আমাদের বন্ধুত্ব তবে বেশ কিছুদিন হলো গঙ্গার পারে সে আর আসেনা।
কী হলো ব্যাপারটা জানতে গিয়ে চারদিনের দিন ফোনটা করতে যাবো এমন সময় হঠাৎ করেই জয়দীপ হাজির আমার বাড়ি আর প্রতিদিনের মতোই আমরা চলে গেলাম গঙ্গা পারে। তবে আজ একটু বসেই আমাদের উঠতে হলো কারন সন্ধ্যে হয়ে গেছিল। কিন্তু কী হলো জয়দীপ তার গঙ্গা পারে রেখে যাওয়া কথাটা আজ তো বললো না। একটু অবাক হলাম বৈকি কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করলাম না কারন একই কথা আর কতবার শুনব।
তবে আজ একদম আশ্চর্যজনক ভাবে জয়দীপ দার চেঞ্জ দেখলাম৷ ও হ্যাঁ দাদাই বলি তবে দাদা কম বন্ধু বেশি।
আজ জয়দীপ দা অফার করল কি রে সুদীপ্ত কি খাবি সিলকাট নাকি লুভিন?
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম বিলম্ব না করেই বললাম অবশ্যই লুভিন খাবো।
তবে ব্যাপারটা মাথায় ঢুকলো না। এই হার কিপটে ১৫ টাকা দিয়ে লভিন অফার করছে কেনো আজ, সেটাই ভেবেছি বাড়ি ফিরে এসে সারারাত ধরে।
কাল জয়দীপ ফোন করে বললো ভাই আজ থেকে আর গঙ্গাপারে যাবো না। আমি বললাম তবে কোথায় যাবো? জয়দীপ দা বললো
অন্যকোথাও যাবো। আমি বললাম মানে টা কি৷
জয়দীপ জানালো কোনো মানে নেই রেডি হো আমি আসছি।
কালকে সিল কাটের পরিবর্তে লুভিন আর আজ গঙ্গাঘাটের পরিবর্তে কোথায় হয় সেটাই দেখার।
প্রতিদিনের মতো জয়দীপ দা তার বাবার স্কুটার নিয়ে আমাকে ডাকতে এসেছে । বললাম কোথায় যাবো গো?
ও জানালো বেশি প্রশ্ন করিস না বইপাড়া যাবো চল।
আমি এক মিলি সেকেন্ড না বিলম্ব করেই বললাম আমি নামব জয়দীপ আমাকে নামা । বই কেনার পয়সা বা ইচ্ছে কোনোটাই আমার নেই।
হ্যাঁ বলে রাখা ভালো আমি মাঝেমাঝে জয়দীপকে নাম ধরে এবং তুই করে ডাকতাম। জয়দীপ বললো শোন না ভাই কিছু বই কিনব না, জাস্ট যাবো, আরে তোর বউদি আসবে।
অ্যাঁ, আমি তো অবাক। জয়দীপ জানালো অ্যাঁ নয় হ্যাঁ আর হাঁ টা বন্ধ কর।
বিস্তারিত জানতে চাওয়ার আগেই যেতে যেতে সব বলে দিলো জয়দীপ দা।
ফেসবুকে আলাপ, মৌ মুখার্জি গ্র্যাজুয়েশন প্রথম বর্ষ, বাংলা অনার্স আর বলল লেখালেখি করে সেই সূত্রেই আলাপ এবং এই বছর "সাঁকো" পাবলিশার্স থেকে সে নাকি বই বের করেছে, বইটির নাম "বৃথা"।
জয়দীপ দা আরও বলল যে, মেয়েটির বাড়ি দূর্গাপুর, পড়াশোনা সূত্রে বেলঘোড়িয়ায় থাকে আর আজ আসছে তার সাথে দেখা করতে বইপাড়া।
এসব কথা শুনে আমার ঢপ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছিল না, কিন্তু জয়দীপ দা বললো ঢপ নয় ফদু ওই দ্যাখ ওই মেয়েটা।
আমি ওদের কাছে যাইনি যদি কিছু খারাপ হয়, জয়দীপকে আমার বিশ্বাস নেই একবার একটা মেয়েকে গার্লফ্রেন্ড সাজিয়ে এনেছিল কিন্তু পরে জানা গেছে উনি ওর পাড়ার এক কাকুর মেয়ে।
তবে এবারটা নকল নয় বুঝতে পারি কারণ দিব্যি কথা বলছে তারা।
একটা শান্ত মতো মেয়ে, সবুজ শাড়ি, চুলটা লম্বা করে নামানো, চোখ দুটো একটু যেন ট্যারা ওই লক্ষ্মী ট্যারা যাকে বলে৷ পরে এই নিয়ে ক্ষ্যাপিয়েছি অনেক জয়দীপ দা কে। হঠাৎ করে সামান্য আমার দিকে তাকালো দুজনেই এবং হাসলো। আমি তো সিওর ব্যাটা জয়দীপ কিছু বলেছে।
এইভাবেই চলতে থাকে এবার থেকে। গঙ্গার পার সেদিন শেষ কাউন্টারেই শেষ হয়ে গেছে। ভীতু রাম গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাবে মোহরকুঞ্জ তাও আমাকে নিয়ে যেতো বিশ্বাস করুন আমি যেতে চাইনি অগত্যা যেতাম, দূরে বসে থাকতাম। জয়দীপ মেয়েটির কোলে মাথা রেখে তার লেখা কবিতা শোনাত আর মেয়েটি জয়দীপের মাথায় বিলি কেটে দিত। মাঝেমাঝে চুমুও খেত তা আমার ভুলবশত দেখা হয়ে গেছে দু-একবার সত্যি বলছি আমার সাদা মনে কোনো কাদা ছিল না। বহুপরে মেয়েটির সাথে আমাকে আলাপ করায় জয়দীপ। বেশ মিশুকে ছিল সে, তাকে দিভাই বলে ডাকতাম।
এইভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েকমাস, জয়দীপ দাও ব্যস্ত হয়ে পরে আর আমিও ব্যস্ত হয়ে পরি কাজের চাপে।
হঠাৎ একদিন খবর আসে আমায় ব্যাঙ্গালোর চলে যেতে হবে প্রথম চাকরি 'সেনটাম প্রাইভেট লিমিটেড'।
সেখানে গিয়ে প্রায় ছয়মাস মতো কোনো কথায় হয়নি জয়দীপের সাথে। এমনও হয়েছে ও ফোন করেছে অথচ কাজের চাপে আমি রিসিভ করতে পারিনি তার ফোন আবার পরে কল ব্যাক করারও সময় পাইনি। কাজের চাপ ভীষণ রকম তার ওপর নতুন কোম্পানি আর নতুন কাজটা তখন আমায় শিখতে হচ্ছে মন দিয়ে।
দীর্ঘ ছয়মাস পর আমি একদিন জয়দীপ দাকে ম্যাসেজ করে বলেছিলাম জয়দীপ দা কেমন আছো?
পাঁচ মিনিট পর উত্তর এসেছিল ভালো নেই। অথচ যে ছেলেটা এতো কথা বলতো আমার সাথে এতোদিন পর সে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলো না একটিবার যে আমি কেমন আছি। তাতে মন খারাপ হয়েছিল আমার।
বৌদির কথা জিজ্ঞেস করলে বলেছিল জানিনা।
তবে জয়দীপ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কবে আসব আমি।
তিন চারদিনের মধ্যেই আসব আমি এটা বলেই ফোনটা কেটে দিই।
তারপর কত গল্প, আর আড্ডা উফফ এইসব ভেবে ভেবে কলকাতা ফেরার আগের চারদিন তো আমি ব্যাঙ্গালোরে ঘুমোতেই পারিনি। ওই হয়না বাড়ি আসার একটা আলাদা তাগিদ সেই তাগিদেই ঘুম ভ্যানিস হয়ে যায় চোখ থেকে।
বাড়ি ফিরে এসেই বিকেল বেলা জয়দীপ দার বাড়ি যায়। কাকিমাকে জিজ্ঞেস করি জয়দীপ দা কই গো? কাকিমা চুপ করে থাকে, জ্যেঠু কে জিজ্ঞেস করলে জ্যেঠুও কেমন নির্বাক। আসলে কাকু-কাকিমা, জ্যেঠু-জ্যেঠিমা এটা আমি গুলিয়ে ফেলি খুব হয়তো সেই জন্যই উত্তরটা দিলো না তারা আর তাই এবার ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই ভাই বললো দাদ ওপরের ঘরে।
ছুটে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ডাকছি কত জয়দীপ দা, জয়দীপ দা বলে। তারপর হাঁপিয়ে ঘরে ঢুকেই দেখি... টেবিলে জল-বাটি, কত কত ওষুধপাতি সাজানো। একটা ক্যাচার গাড়ি, তাকে সাজানো ঝুল পড়া বই, ডেস্কটপে ধুলো পড়েছে। খাটের ওপর 'সঞ্চয়িতা ', 'গীতবিতান', 'উড়ন্ত সব জোকার', জয়দীপ দার ডায়েরি, কলম, 'বৃথা', আর জয়দীপ দার লেখা একটা কবিতা "কাদম্বরীর চোখ"।
ঘরের দেওয়াল জুড়ে কত কথা লেখা আছে, আছে রবীন্দ্রসেতুর ছবি যেটা পুসপেন্দু দা তুলেছিল, নীচে লেখা ছিল ফোটোগ্রাফের নাম পুসপেন্দু।
দেওয়ালে আরও একটা কথা লেখা ছিল সেটা হলো, সন্ধ্যে লাগোয়া সেই কথাটা যেটা রোজ গঙ্গা পার থেকে উঠে যাওয়ার আগে জয়দীপ দা বলতো...
" দেখবি সুদীপ্ত যেদিন খুব বৃষ্টি পড়বে একদম আকাশ ফেটে আর রবীন্দ্র সেতুর সবটা ভিজে যাবে, সেতুর ফাঁক-ফোঁকর-তলাটাও, সেদিন সেতু বেয়ে নেমে আসবে "বৃষ্টিবউ"।
এটুকুই যথেষ্ট ছিল আমার জন্য বাকি উত্তর ওই ক্যাচার গাড়িতে ছিল যা আমি আপনাদের
শোনাতে পারলাম না!
লেখাঃ- সুদীপ্ত সেন (ডট.পেন)
গড়িয়ার সাত নম্বর লেনের বাসিন্দা জয়দীপ। জয়দীপ রায়, গালে এক চাপাল দাড়ি, মাস্টার ডিগ্রীতে পাঠ্যরত একটা অশৌখিন লেখক-লেখক চেহারার ছেলে।
বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের একটা ছেলে জয়দীপ। বাবার বিশাল ব্যবসা, ছোটো একটা ভাই, মা গৃহবধূ আর এক দিদি যার বিয়ে হয়ে গেছে দক্ষিণ কলকাতায় বছর পাঁচেক আগে।
জয়দীপর সাথে আমার পরিচয় হয় হঠাৎই ওই লেখালেখির সূত্রে কোনো এক পত্রিকার বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে। জয়দীপের অন্যরকম কলম টান আছে। কোনোদিন সময় পেলে দেখাব আপনাদের।
আমরা ভালোই বন্ধু দুজনে। আমরা রোজ গঙ্গার ধারে বসে রবীন্দ্রসেতুতে তাকিয়ে থাকি সেখানে কিছুক্ষণ ফেসবুক ঘাঁটাঘাঁটি করে জয়দীপ আর তখন ও আমার সাথে কথা বলে না, আমিও বলিনি কোনোদিন।
তারপর ঠিক সন্ধ্যেলাগোয়া করে উঠে যায় আমরা আর জয়দীপ যেটা বলে রোজ সেটাই বললো আজও।
তারপর একটা পাঁচ টাকার সিলকাট, গোপী দার দোকানের চা আর একটা প্রজাপতি বিস্কুট। কোনোদিন ও একটার টাকা দেয় বা কোনোদিন আমি।
তবে ইদানিং সে একটা ছোটো কাগজের অফিসে চাকরি করে, শুনেছি তার কোনো এক দূর সম্পর্কের দাদা এই চাকরিটা করে দিয়েছে তাকে।
ভালোই চলছিল আমাদের বন্ধুত্ব তবে বেশ কিছুদিন হলো গঙ্গার পারে সে আর আসেনা।
কী হলো ব্যাপারটা জানতে গিয়ে চারদিনের দিন ফোনটা করতে যাবো এমন সময় হঠাৎ করেই জয়দীপ হাজির আমার বাড়ি আর প্রতিদিনের মতোই আমরা চলে গেলাম গঙ্গা পারে। তবে আজ একটু বসেই আমাদের উঠতে হলো কারন সন্ধ্যে হয়ে গেছিল। কিন্তু কী হলো জয়দীপ তার গঙ্গা পারে রেখে যাওয়া কথাটা আজ তো বললো না। একটু অবাক হলাম বৈকি কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করলাম না কারন একই কথা আর কতবার শুনব।
তবে আজ একদম আশ্চর্যজনক ভাবে জয়দীপ দার চেঞ্জ দেখলাম৷ ও হ্যাঁ দাদাই বলি তবে দাদা কম বন্ধু বেশি।
আজ জয়দীপ দা অফার করল কি রে সুদীপ্ত কি খাবি সিলকাট নাকি লুভিন?
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম বিলম্ব না করেই বললাম অবশ্যই লুভিন খাবো।
তবে ব্যাপারটা মাথায় ঢুকলো না। এই হার কিপটে ১৫ টাকা দিয়ে লভিন অফার করছে কেনো আজ, সেটাই ভেবেছি বাড়ি ফিরে এসে সারারাত ধরে।
কাল জয়দীপ ফোন করে বললো ভাই আজ থেকে আর গঙ্গাপারে যাবো না। আমি বললাম তবে কোথায় যাবো? জয়দীপ দা বললো
অন্যকোথাও যাবো। আমি বললাম মানে টা কি৷
জয়দীপ জানালো কোনো মানে নেই রেডি হো আমি আসছি।
কালকে সিল কাটের পরিবর্তে লুভিন আর আজ গঙ্গাঘাটের পরিবর্তে কোথায় হয় সেটাই দেখার।
প্রতিদিনের মতো জয়দীপ দা তার বাবার স্কুটার নিয়ে আমাকে ডাকতে এসেছে । বললাম কোথায় যাবো গো?
ও জানালো বেশি প্রশ্ন করিস না বইপাড়া যাবো চল।
আমি এক মিলি সেকেন্ড না বিলম্ব করেই বললাম আমি নামব জয়দীপ আমাকে নামা । বই কেনার পয়সা বা ইচ্ছে কোনোটাই আমার নেই।
হ্যাঁ বলে রাখা ভালো আমি মাঝেমাঝে জয়দীপকে নাম ধরে এবং তুই করে ডাকতাম। জয়দীপ বললো শোন না ভাই কিছু বই কিনব না, জাস্ট যাবো, আরে তোর বউদি আসবে।
অ্যাঁ, আমি তো অবাক। জয়দীপ জানালো অ্যাঁ নয় হ্যাঁ আর হাঁ টা বন্ধ কর।
বিস্তারিত জানতে চাওয়ার আগেই যেতে যেতে সব বলে দিলো জয়দীপ দা।
ফেসবুকে আলাপ, মৌ মুখার্জি গ্র্যাজুয়েশন প্রথম বর্ষ, বাংলা অনার্স আর বলল লেখালেখি করে সেই সূত্রেই আলাপ এবং এই বছর "সাঁকো" পাবলিশার্স থেকে সে নাকি বই বের করেছে, বইটির নাম "বৃথা"।
জয়দীপ দা আরও বলল যে, মেয়েটির বাড়ি দূর্গাপুর, পড়াশোনা সূত্রে বেলঘোড়িয়ায় থাকে আর আজ আসছে তার সাথে দেখা করতে বইপাড়া।
এসব কথা শুনে আমার ঢপ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছিল না, কিন্তু জয়দীপ দা বললো ঢপ নয় ফদু ওই দ্যাখ ওই মেয়েটা।
আমি ওদের কাছে যাইনি যদি কিছু খারাপ হয়, জয়দীপকে আমার বিশ্বাস নেই একবার একটা মেয়েকে গার্লফ্রেন্ড সাজিয়ে এনেছিল কিন্তু পরে জানা গেছে উনি ওর পাড়ার এক কাকুর মেয়ে।
তবে এবারটা নকল নয় বুঝতে পারি কারণ দিব্যি কথা বলছে তারা।
একটা শান্ত মতো মেয়ে, সবুজ শাড়ি, চুলটা লম্বা করে নামানো, চোখ দুটো একটু যেন ট্যারা ওই লক্ষ্মী ট্যারা যাকে বলে৷ পরে এই নিয়ে ক্ষ্যাপিয়েছি অনেক জয়দীপ দা কে। হঠাৎ করে সামান্য আমার দিকে তাকালো দুজনেই এবং হাসলো। আমি তো সিওর ব্যাটা জয়দীপ কিছু বলেছে।
এইভাবেই চলতে থাকে এবার থেকে। গঙ্গার পার সেদিন শেষ কাউন্টারেই শেষ হয়ে গেছে। ভীতু রাম গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাবে মোহরকুঞ্জ তাও আমাকে নিয়ে যেতো বিশ্বাস করুন আমি যেতে চাইনি অগত্যা যেতাম, দূরে বসে থাকতাম। জয়দীপ মেয়েটির কোলে মাথা রেখে তার লেখা কবিতা শোনাত আর মেয়েটি জয়দীপের মাথায় বিলি কেটে দিত। মাঝেমাঝে চুমুও খেত তা আমার ভুলবশত দেখা হয়ে গেছে দু-একবার সত্যি বলছি আমার সাদা মনে কোনো কাদা ছিল না। বহুপরে মেয়েটির সাথে আমাকে আলাপ করায় জয়দীপ। বেশ মিশুকে ছিল সে, তাকে দিভাই বলে ডাকতাম।
এইভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েকমাস, জয়দীপ দাও ব্যস্ত হয়ে পরে আর আমিও ব্যস্ত হয়ে পরি কাজের চাপে।
হঠাৎ একদিন খবর আসে আমায় ব্যাঙ্গালোর চলে যেতে হবে প্রথম চাকরি 'সেনটাম প্রাইভেট লিমিটেড'।
সেখানে গিয়ে প্রায় ছয়মাস মতো কোনো কথায় হয়নি জয়দীপের সাথে। এমনও হয়েছে ও ফোন করেছে অথচ কাজের চাপে আমি রিসিভ করতে পারিনি তার ফোন আবার পরে কল ব্যাক করারও সময় পাইনি। কাজের চাপ ভীষণ রকম তার ওপর নতুন কোম্পানি আর নতুন কাজটা তখন আমায় শিখতে হচ্ছে মন দিয়ে।
দীর্ঘ ছয়মাস পর আমি একদিন জয়দীপ দাকে ম্যাসেজ করে বলেছিলাম জয়দীপ দা কেমন আছো?
পাঁচ মিনিট পর উত্তর এসেছিল ভালো নেই। অথচ যে ছেলেটা এতো কথা বলতো আমার সাথে এতোদিন পর সে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলো না একটিবার যে আমি কেমন আছি। তাতে মন খারাপ হয়েছিল আমার।
বৌদির কথা জিজ্ঞেস করলে বলেছিল জানিনা।
তবে জয়দীপ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কবে আসব আমি।
তিন চারদিনের মধ্যেই আসব আমি এটা বলেই ফোনটা কেটে দিই।
তারপর কত গল্প, আর আড্ডা উফফ এইসব ভেবে ভেবে কলকাতা ফেরার আগের চারদিন তো আমি ব্যাঙ্গালোরে ঘুমোতেই পারিনি। ওই হয়না বাড়ি আসার একটা আলাদা তাগিদ সেই তাগিদেই ঘুম ভ্যানিস হয়ে যায় চোখ থেকে।
বাড়ি ফিরে এসেই বিকেল বেলা জয়দীপ দার বাড়ি যায়। কাকিমাকে জিজ্ঞেস করি জয়দীপ দা কই গো? কাকিমা চুপ করে থাকে, জ্যেঠু কে জিজ্ঞেস করলে জ্যেঠুও কেমন নির্বাক। আসলে কাকু-কাকিমা, জ্যেঠু-জ্যেঠিমা এটা আমি গুলিয়ে ফেলি খুব হয়তো সেই জন্যই উত্তরটা দিলো না তারা আর তাই এবার ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই ভাই বললো দাদ ওপরের ঘরে।
ছুটে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ডাকছি কত জয়দীপ দা, জয়দীপ দা বলে। তারপর হাঁপিয়ে ঘরে ঢুকেই দেখি... টেবিলে জল-বাটি, কত কত ওষুধপাতি সাজানো। একটা ক্যাচার গাড়ি, তাকে সাজানো ঝুল পড়া বই, ডেস্কটপে ধুলো পড়েছে। খাটের ওপর 'সঞ্চয়িতা ', 'গীতবিতান', 'উড়ন্ত সব জোকার', জয়দীপ দার ডায়েরি, কলম, 'বৃথা', আর জয়দীপ দার লেখা একটা কবিতা "কাদম্বরীর চোখ"।
ঘরের দেওয়াল জুড়ে কত কথা লেখা আছে, আছে রবীন্দ্রসেতুর ছবি যেটা পুসপেন্দু দা তুলেছিল, নীচে লেখা ছিল ফোটোগ্রাফের নাম পুসপেন্দু।
দেওয়ালে আরও একটা কথা লেখা ছিল সেটা হলো, সন্ধ্যে লাগোয়া সেই কথাটা যেটা রোজ গঙ্গা পার থেকে উঠে যাওয়ার আগে জয়দীপ দা বলতো...
" দেখবি সুদীপ্ত যেদিন খুব বৃষ্টি পড়বে একদম আকাশ ফেটে আর রবীন্দ্র সেতুর সবটা ভিজে যাবে, সেতুর ফাঁক-ফোঁকর-তলাটাও, সেদিন সেতু বেয়ে নেমে আসবে "বৃষ্টিবউ"।
এটুকুই যথেষ্ট ছিল আমার জন্য বাকি উত্তর ওই ক্যাচার গাড়িতে ছিল যা আমি আপনাদের
শোনাতে পারলাম না!
Comments
Post a Comment